Trisangam international refereed journal
Not a member yet
537 research outputs found
Sort by
Galpokar Premendra Mitrer Nirbachita Galpe Nagarik Chetanar Unmachan/ গল্পকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের নির্বাচিত ছোটগল্পে নাগরিক চেতনার উন্মোচন
রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা কথাসাহিত্যে দিক পরিবর্তনকারী এক ক্রান্তিকালের বাণীশিল্পী প্রেমেন্দ্র মিত্র। জীবনের শত সহস্র আশাভঙ্গের কাহিনী, রিক্ত হৃদয়ের দীর্ণতা, একটি প্রাণস্পন্দনের আশ্চর্য উদ্ভাসন, জীবন প্রত্যয় থেকে একপ্রকার আশাবাদী মন সব মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যের শিল্পরীতি ও অর্থনৈতিক সংকট ও সমাজ পরিবর্তনের কালচক্রে উচ্চ, মধ্য ও নিম্নবিত্ত নাগরিক জীবনের হাহাকার, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তির দোলাচলতা এমন নৈপুণ্যে বিশ্লেষিত হয়েছে, যা আলোচ্য প্রবন্ধে আলোকপাত করার চেস্টা করা হয়েছে।
এই নাগরিক চেতনায় তিনি ‘ছোট সুখ ছোট ব্যাথা’র যে তত্ত্ব সেই দ্বান্দ্বিকতাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল, কখনো সাংসারিক রোমান্টিকতার ক্ষুদ্র পরিসরে পৃথক স্বাতন্ত্র্যে ব্যাখ্যায়িত করেছেন। একদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক গতিশীলতা, শ্রমের বিভাজন প্রেমেন্দ্র মিত্রের বহু লেখনীকে সমৃদ্ধ করেছে, অন্যদিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাবাদ, বানিজ্য সম্প্রসারণ, নগর সৃষ্টি বা আধুনিক নগরায়ণের ধ্যান-ধারণা গড়ে উঠতে থাকে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে বিশ শতকের তিরিশের দশক থেকে বাংলা সাহিত্যে শহরের কথা ১৯২৯ এ প্রকাশিত ‘পথের পাঁচালী’, ১৯৩১ এ প্রকাশিত ‘চৈতালি ঘূর্ণি’, ১৯৩৬ এ প্রকাশিত ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র মতো কালজয়ী উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে নাগরিক চেতনা নানা আঙ্গিকে সঞ্জাত হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনব্যাবস্থার পরিশীলিত রুচির আগমন, আত্মপরিচয়ের সংকট নাগরিক চেতনার রঙে রঞ্জিত হয়েছে লেখকের কালজয়ী সৃষ্টিতে।
প্রেমেন্দ্র মিত্র মধ্যবিত্ত জীবনকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলেই নাগরিক চেতনা ও মহানগরের সংকট, যান্ত্রিকতা, মনস্তাত্ত্বিকতা, শিকড় থেজে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সূত্রপাত, অর্থনৈতিক শোষণের কাছে বিকৃত মনুষ্যত্ব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ব অর্থনৈতিক অধঃপতন অত্যন্ত সূচারুভাবে বর্ণিত হতে দেখা গেছে। এরই মাঝে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে মানুষের স্বপ্ন, আশা, কল্পনা, জেগে থাকে। মহানগরে যন্ত্রের নির্মোঘ যেমন সত্যি, তেমনি মানুষের উৎসাহ জেগে থাকাও সত্যি, এই দুটি চিত্রই এখানে লেখক অত্যন্ত মর্মস্পর্শী আবেদনে প্রকাশ করেছেন। মহানগরের যান্ত্রিক কলরব, জটিলতা, আলোকোজ্জ্বল জাঁক-জমক, মানুষের বিবেক বুদ্ধি, অদম্য উৎসাহ মধ্যবিত্ত জীবনের কথাকার রূপে তাই লেখক জানিয়েছেন, যেন পাঠক দর্শক তাঁর সঙ্গেই নগর জীবনকে প্রত্যক্ষ করতে করতে এগিয়ে চলুক, যে মহানগরের চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আকাশের তলায় পৃথিবীর মতো অজস্র ক্ষত, আবার যে মহানগর কখনো উঠেছে মিনারে, মন্দিরের চূড়ায়, আর অভ্রভেদী প্রাসাদ শিখরে তারাদের দিকে, প্রার্থনা মতো মানবাত্মার। তিনি তাই তাঁর সাহিত্যিক ধ্যান-ধারণার মধ্যে একদিকে মানুষ ও অন্যদিকে নগরকে উপজীব্য করেছেন। মধ্যবিত্তের সংকটে যেখানে রোমান্টিকতা ক্ষুদ্র বিলাসিতা মাত্র, তবুও সেখানে মানুষ বেঁচে থাকার আশা ছাড়েনা। এই ভাবনাই ‘পুন্নাম’, ‘শুধু কেরানী’, ‘হয়তো’, ‘মহানগর’, ‘সংসার সীমান্তে’ প্রভৃতি গল্পে নগর সভ্যতার ভিত্তিভূমি রচনা করেছে।
তাই পরিশেষে একথাই বলা যায় কথাসাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর আজীবন ব্যাপী সাহিত্য সাধনায় ‘পুন্নাম’-এ নাগরিক সংগ্রাম, ‘হয়তো’-তে সামন্ততান্ত্রিক রূপ, শহরের ভীতি, ‘সংসার সীমান্ত’-তেও শহরের যান্ত্রিকতা, কলুষতা, ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ এ শহরবাসী যুবকের মৌখিক সহানুভূতির ঊর্ধ্বে মেকী মূল্যবোধ বা মূল্যবোধহীনতা, তার দ্বারা যামিনীর প্রতারিত হওয়ার চিত্রগুলি এত সংবেদনশীল ভাবে প্রত্যক্ষ গ্রাহ্য হয়েছে যা নিঃসন্দেহে পাঠক দর্শককে ভাবিয়ে তোলে প্রবন্ধ শেষে একথা বললে অত্যুক্তি হয়না
Kabikangkan Mukunda chakrabarty o Ramananda jatir Chandi mangal kabya : ekti tulanamulak adhyan/ কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তী ও রামানন্দ যতির চণ্ডীমঙ্গলকাব্য : একটি তুলনামূলক অধ্যায়ন
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আমাদের ‘মঙ্গলকাব্য’ সম্পর্কে আলোচনা করা দরকার, অর্থাৎ মঙ্গলকাব্য কি? এ প্রসঙ্গে বলতে হয় যে, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা মঙ্গলকাব্য। যা মূলতঃ খ্রীষ্টিয় পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর ফসল। ড.অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ বইতে মঙ্গল কাব্য বলতে বুঝিয়েছেন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা প্রচার সম্মন্ধীয় এক প্রকার আখ্যানকাব্যকে। মানুষ বিপদে পড়লে দেব-দেবীদের শরণ করেন। বাংলার মঙ্গলকাব্যগুলির উৎপত্তির মূলে এই ধরনের আপদ-বিপদের প্রভাব আছে। যেমন– সাপের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য সর্পদেবী মনসার পূজা, তেমনি হিংস্র পশুর হাত থেকে রক্ষা পেতে দেবী চণ্ডীর পূজা। সাধারণ ভাবে বলা যায় বেশীর ভাগ মঙ্গল কাব্যেই দেবীর পূজা প্রচারিত হয় এবং এই পূজা প্রচারের জন্য কোন না কোন ভক্তকে অভিশাপ প্রাপ্ত হতে হয়ে আসতে হয় মর্ত্যে। কার্য সমাপ্ত ঘটলে তারা আবার ফিরে যান স্বর্গে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দেব-দেবীর প্রচারমূলক এক বিশেষ সাহিত্য শাখা হল ‘মঙ্গলকাব্য’। এই মঙ্গলকাব্যগুলি যারা শুনতেন বা যারা শোনাতেন, সকলেরই মঙ্গল হত। এই মঙ্গল কাব্য ধারায় যে মঙ্গলকাব্যগুলি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, সেগুলি হল- মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, শিবায়ন ও অন্নদামঙ্গল প্রভৃতি। এই সব মঙ্গলকাব্যগুলি মোটামুটি ভাবে পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর সময়কালে রচিত হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়কালে শাসক সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কাব্যের মূল কাঠামো এক থাকলেও সামাজিক রীতি-নীতি, খাদ্য, পোষাক, আচার-আচরণের বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে
Ketaka das Khemanander Manosa Mangolkabyo : Narir Attoprotistha, Pratibadi Sattar Akhyan/ কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গলকাব্য : নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠা, প্রতিবাদীসত্তার আখ্যান
উনিশ শতকেই আমাদের পরিচয় ঘটল পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে। অনেকে এই সময়ে ইউরোপীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। ফলত নৈতিক কারণেই মেয়েদের প্রতিও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটতে শুরু করল। উনিশ শতকেই নবচেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল, মেয়েদের জীবনযাত্রার মানোয়ন্নের নানা সামাজিক উদ্যোগ। সতীদাহ প্রথা, কৌলীন্য প্রথা, প্রভৃতির বিরুদ্ধে ও বিধবাবিবাহের পক্ষে একদিকে যেমন আন্দোলন দানা বাঁধল, তেমনি অন্যদিকে পুথিগত শিক্ষায় মেয়েদেরকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য গড়ে তোলা হল বিভিন্ন বিদ্যালয়। ধীরে ধীরে দিন যত এগিয়েছে ফেমিজম এর ধারণা তত সুদৃঢ় হয়েছে। বর্তমান দিনে নারীবাদ তথা নারীবাদী আন্দোলন নিয়ে সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি এ সম্পর্কে আলাদা আলোচনা, লেখা-লিখি যথেষ্ট হচ্ছে।এইভাবে নারীপ্রগতির ভাবনা ক্রমশ গতি পেতে থাকে এবং স্ত্রী শিক্ষার বিকাশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানা আইন জারি হয়। ফলে নারীর মনন ও চিন্তনে নিজেদের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেতে থাকে। আজকের নারীবাদ ও নারীবাদীদের চিন্তাভাবনা, আন্দোলন এটা ঠিকই আছে। তবে আমরা যদি বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করি তাহলে দেখা যাবে উনিশ একুশ শতকে নয়, নারীকে মানবী হিসাবে দেখা, তার স্বাধীনচেতনা স্বাতন্ত্র্যবোধ মধ্যযুগের সাহিত্যেও বিভিন্ন ধারায় টুকরো ভাবে এসেছে। একটু যদি পিছিয়ে যাই আমরা তাহলে লক্ষ করবো প্রাগাধুনিক বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্যের নারীরাও ছিলেন অনেকটাই সাহসী ও ব্যতিক্রমী। তারাও ছিলেন যথার্থই প্রতিবাদিনী। সমাজের নানা সংস্কারের মধ্যেও, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবাদের সুর তাঁদের কণ্ঠেও ধ্বনিত হয়েছে। মনে রাখতে হবে আজকের দিনের মত সামাজিক নানা আন্দোলনের প্রভাব কিন্তু সমাজে তখন প্রভাব ফেলেনি। তবুও মধ্যযুগের বিভিন্ন কবিদের কাব্যে বিক্ষিপ্তভাবে নারীর প্রতিবাদী রূপটি পরিস্ফুট হয়েছে। তবে গভীরভাবে এসেছে কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল কাব্যে
Nirbachita Chata Galper Aloke Premendra Mitrer Manab Prem/ নির্বাচিত ছোটগল্পের আলোকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের মানবপ্রেম
বিশ্বের চারজন সেরা গল্পকার হিসেবে এডগার অ্যালন পো, মোঁপাসা, অন্তন চেকভ এবং রবীন্দ্রনাথের নাম করা যায়। তেমনই বাংলা ছোটগল্পের লেখক হিসেবে অন্যতম সেরা ছিলেন—প্রেমেন্দ্র মিত্র, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ এবং বুদ্ধদেব বসু। এই সকল বাংলা ছোটগল্প লেখকদের মধ্যে প্রেমেন্দ্র মিত্র একটি পৃথক স্থান দখল করেছিলেন, এ বিষয়ে কারো দ্বিমত থাকা সঠিক নয়। প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পে তাঁর বিষয় নির্বাচন, লেখনী শৈলী এবং সর্বপরি প্রকাশভঙ্গিতে স্বতন্ত্র আবেদনের অধিকারী
Domer Chita : Dom Samprodayer Jiboka Kendrik Jibon Porichay/ ডোমের চিতা : ডোম সম্প্রদায়ের জীবিকাকেন্দ্রিক জীবন পরিচয়
রমেশচন্দ্র সেন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কথাসাহিত্যিক। পেশায় তিনি একজন কবিরাজ হলেও সাহিত্য রচনার প্রতি তাঁর অত্যন্ত অনুরাগ কৈশোর থেকেই। তিনি লক্ষ করেছেন চল্লিশের দশকের উত্তালময় পরিস্থিতি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালীন যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকট থেকে সৃষ্টি হওয়া অচলাবস্থা, ভারতের মানুষদের উপর ব্রিটিশদের বাড়িয়ে দেওয়া শোষণের মাত্রা। এই সবকিছুই তাঁর মধ্যে সাহিত্য রচনায় বিপুল পরিমাণে প্রভাব ফেলেছিল। কবি ও কথাসাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র একসময় কবিতার ছন্দে লিখেছেন-
“মানুষের মানে চাই–
গোটা মানুষের মানে
রক্ত, মাংস, হাড় মেদ মজ্জা
ক্ষুধা, তৃষ্ণা, লোভ,কাম হিংসা সমেত
গোটা মানুষের মানে।
Sundarbaner Lokabaddya Jantra : Dhak – Dhol – Kashi/ সুন্দরবনের লোকবাদ্যযন্ত্র: ঢাক-ঢোল-কাশি
ভারতবর্ষের মানচিত্রে সুন্দরবন একটি উল্লেখযোগ্য নাম। জলা জঙ্গলাময় সুন্দরবন অঞ্চল।জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ। কিন্তু জলে কুমির আর ডাঙ্গায় বাঘ নিয়েও মানুষ প্রতিনিয়ত করে চলেছে টিকে থাকার লড়াই। আর এই টিকে থাকার লড়াই এর সাথেই যুক্ত হয়েছে জীবনকে আনন্দ দান করার ইচ্ছাশক্তি।
“সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ
নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক
এল মহাজন্মের লগ্ন”—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুন্দরবনের মানুষেরা তাদের জটিল জীবনের মাঝেও আপন করে নিয়েছে লোকবাদ্যকে। আমার আলোচনার মধ্যে দিয়ে সেই সব লোকবাদ্য ঢাক-ঢোল-কাশি প্রভৃতির পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করবো
Uttarbanger Bodo-Mech Janajatir Lokaja Utsab o Palaparban/ উত্তরবঙ্গের বোড়ো-মেচ জনজাতির লোকজ উৎসব ও পালাপার্বণ
উত্তরবঙ্গের বোড়ো-মেচ জনজাতির লোকজ উৎসব ও পালাপার্বণ আলোচনার আগে ‘উত্তরবঙ্গ’ সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকা দরকার। ‘উত্তরবঙ্গ’ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরাংশে অবস্থিত দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর-দক্ষিণ দুই দিনাজপুর এবং মালদহ এই সাতটি জেলা নিয়ে গঠিত। আসলে এই জেলাগুলি ‘জলপাইগুড়ি ডিভিশনভুক্ত’, এর ভৌগোলিক সীমানা উত্তরে সিকিম ও ভুটান রাষ্ট্র, পশ্চিম সীমানায় বিহার রাজ্য ও নেপাল রাষ্ট্র, পূর্ব সীমানায় অসম রাজ্য, দক্ষিণে গঙ্গা নদী ও মুর্শিদাবাদ এবং দক্ষিণ-পূর্বে বাংলাদেশ। কিন্তু আজকে সাধারণভাবে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং দার্জিলিং জেলাকে উত্তরবঙ্গ হিসাবে ধরে নেওয়া যায়।
বিশ্বের মধ্যে বৈচিত্র্যের আর এক নাম হল ‘উত্তরবঙ্গ’। বৈচিত্র্য যেমন এখানকার প্রকৃতিতে তেমনি রয়েছে মানব সমাজে। ভারততীর্থের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ উত্তরবঙ্গের ভূখণ্ডে চারটি ভাষাগোষ্ঠী বিদ্ধমান— ভারতীয় আর্য, দ্রাবিড়, অস্ট্রিক ও মঙ্গোলীয়। আমরা জানি উত্তরবঙ্গে বোড়ো-মেচ, রাভা, গারো, টোটো, ধীমাল, চাঁই, লেপচা, তামাং, ওঁরাও, মুন্ডা, সাঁওতাল, রাজবংশী প্রভৃতি জনজাতির বসবাস— যার ফলে মিশ্র সংস্কৃতি এ-মাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বোড়ো-মেচ জনজাতি মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এই মঙ্গোলীয় জনজাতির আগমন সম্পর্কে গবেষক প্রত্নতত্ত্ববিদ্গণের কাছে জানা যায় বোড়ো-মেচ জনজাতি খ্রিস্টপূর্ব সহস্রাব্দের পূর্বেই ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিল এবং খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম থেকে চতুর্থ শতকের মধ্যেই হিমালয় পর্বতমালার দক্ষিণের ঢালু থেকে উত্তরপূর্ব ভারতে, বিহার সংলগ্ন নেপাল, অসম ও উত্তরবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল। উত্তরবঙ্গে মূলত যে-চারটি জেলায় বোড়ো-মেচ জনজাতির বসবাস, সেটি হল—দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার।
প্রাচীন যুগ থেকে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে জীবনযাপন করার ফলে নিজস্ব ‘বাথৌ’ ধর্ম যেমন গড়ে উঠেছে তেমনি সমাজের নতুন নতুন আচার-আচরণ, নীতি, বেশ-ভূষা, ভাষা এবং সংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে। আমোদপ্রিয় এই বোড়ো-মেচ জনগোষ্ঠী বিভিন্ন পূজাপার্বণ, অনুষ্ঠান ও নাচ-গানের মধ্য দিয়ে তাঁদের আবেগকে নানা আঙ্গিকে তুলে ধরে। যেমন— নববর্ষ, কৃষি-জীবনের সুখ-দুঃখ, মৎস ও পশু শিকার, বিবাহ ও প্রেমগীত এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্যযোগ্য। উত্তরবঙ্গের বোড়ো-মেচ জনজাতি বর্তমানে বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের লোকসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা অনবরত চালিয়ে যাচ্ছে। আর এই উৎসব অনুষ্ঠানে তাঁরা একদিকে যেমন একে ওপরের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে ঠিক তেমনি এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বাৎসরিক নানা অনুষ্ঠান উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই হয়ে থাকে। যেমন— ‘বোড়ো সাহিত্য সভা’, ‘বোড়ো কৃষ্টি আফাৎ’, ‘বৈশাগু ফৈস্টিভাল’ ইত্যাদি